10 November, 2015

দশাবতার তাস - এক বিলুপ্তপ্রায় শিল্প ও এক বিলুপ্তপ্রায় খেলা







দশাবতার তাস
এক বিলুপ্তপ্রায় শিল্প ও এক বিলুপ্তপ্রায় খেলা
সাধারণ প্রচলিত ভারতীয় ইতিহাস বলছে পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে তাস খেলার উদ্ভব কিন্তু বিষ্ণুপুরের ইতিহাস বলছে মল্লরাজাদের সমৃদ্ধিকালে দশাবতার তাস আর তাস খেলার প্রবর্তন হয়হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই ১৮৯৫ সালের এসিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের এক ছোট্ট নোটে বলছেন ...I fully believe that the game was invented about eleven or twelve hundred years before the present date. শাস্ত্রী মশাই-এর হিসেব অনুযায়ী এই খেলার উদ্ভব সপ্তম-অষ্টম শতকপ্রথম কারণ সাধারণতঃ প্রচলিত দশাবতার বিশ্বাসে জগন্নাথ বা বুদ্ধের স্থান নবম - কল্কীর(স্মরণ করুন কবি কোকিল জয়দেবের দশাবতার শ্লোকাবলী - প্রলয় প্রলয়ধি জলে-র বুদ্ধসংক্রান্ত শ্লোকটি) আগেকিন্তু দশাবতার তাস অনুযায়ী জগন্নাথ বা বুদ্ধদেবের স্থান পঞ্চমশাস্ত্রীমশাইএর যুক্তি ধরে বলাযায়, বাংলায় এমন এক সময়ে দশাবতার তাসের খেলার প্রবর্তণ হয়েছিল, যখন বুদ্ধদেব পঞ্চম অবতার রূপে গণ্যতাসে বুদ্ধমুর্তি আদতে জগন্নাথ মূর্তি, - কেবল মাথা ও হাতসহ দেহকাণ্ডের মূর্তিসুতরাং জীবের ক্রমবিকাশেরস্তরে নৃসিংহ(অর্ধ নর অর্ধ পশু) এবং বামনের (পূর্ণ নর) মধ্যবর্তী স্থান পেয়েছেন তিনি - অর্থাত্ নিম্নতম জীব মৎস থেকে পূর্ণ মানব পর্যন্ত বিকাশের ইতিহাসের একদম মাঝখানটি অধিকার করে আছেন তিনি - তাই বিনয় ঘোষবাবু এটিকে বলছেন ...খুব যুক্তিসংগত স্থানআর ভারতীয় চিহ্ণতত্বের বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গী হিসেবে যদি দেখা যায়, দশাবতার তাসে বুদ্ধের প্রতীক পদ্মঅর্থাত্ এই তাসটি এমন সময় প্রতিভাত হয় যখন বুদ্ধ পদ্মপাণিরূপে পরিচরত ছিলেন - অর্থাত্ পদ্মই ছিল তাঁর পুজোর প্রতীক - যে সময়ের বাংলার কথা আমরা আলোচনা করছি সেটি হল মহাযানী বাংলার কাল৮০০ থেকে ১০০০ খ্রীষ্টাব্দের সময় - পাল রাজত্বে বা তার কিছু আগেও হতে পারেজয়দেব বা ক্ষেমেন্দ্রর কালে প্রচলিত ধারার উৎপত্তি হলেও পাল রাজাদের আগেও এই দশাবতার তাস খেলার প্রচলন ছিল
দশাবতার তাস খেলা, অঙ্কণরীতি, মুদ্রা, রংকরার পদ্ধতি দেখলে পাল যুগেরই কথা সর্বাগ্রে মনে আসেএদের ঐতিহ্যই আজ বহন করছেন ফৌজদার পরিবার বর্তমানে শীতল ফৌজদার 
কি এই দশাবতার তাস – কি তার বৈশিষ্ট্য ? তাস আকারে গোল এবং ১২০টা তাসের মধ্যে ১০টি তাসে বিষ্ণুর দশ অবতারের ছবি যথা মৎস, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, জগ্ননাথ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম এবং কল্কির ছবি হাতে আঁকা থাকে। প্রতি অবতারের অধীনে একজন রাজা ও একজন মন্ত্রী থাকেন। তাঁদের প্রত্যেকের অধীনে থাকে অস্ত্র – শস্ত্র। এইভাবে প্রত্যেক অবতারের নিচে বা অধীনে ১১টা তাস থাকে। প্রতি অবতারের পয়েন্ট আলাদা। সময় ও আবহাওয়া অনুযায়ী অবতারদের পয়েন্ট বদলে যায়। যেমন সকাল বেলা সূর্য ওঠার পর “রাম” অবতার তাসের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশী কিন্ত সেই সময় বৃষ্টি হলে “কূর্ম” অবতারের পয়েন্ট বেশী হবে।মল্ল রাজাদের আমলে খেলার আগে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে ৫ জন খেলোয়াড়কে আসতে হত। ৬টা আসন পাতা হত ৫ জন নিজ আসনে বসতেন, মাঝের আসন শ্রী বিষ্ণুর নামে রাখা হত।

এবার বলি এই তাস ও শীতল বাবুকে খুঁজে পাওয়ার গল্প। আসলে অনেক ছোটবেলায় খুব সম্ভবত শুকতারায় বিষ্ণুপুর তথা এই তাসের কথা পড়ি। তারপর থেকেই মনে ইচ্ছা ছিল। বিষ্ণুপুরে ঢোকার পরেই দু একটি দোকানে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেউ বলতে পারে নি। শেষে দলমাদল কামানের সামনে একটি দোকানে জিজ্ঞাসা করাতে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন মদনমোহন মন্দিরের কাছে শাঁখারিপাড়ায় গিয়ে ফৌজদারদের কথা বললে যে কেউ দেখিয়ে দেবে। আমাদের সারথি বললেন দাদা খুব সরু গলি হবে গাড়ী নিয়ে যাওয়া মুশকিল আমি সরকারী ট্যুরিস্ট লজের সামনে গাড়ী রাখছি, আপনি রিক্সা নিয়ে চলে যান। ঠিক আছে তবে তাই হোক। রিক্সাওয়ালার সাথে কথা হললে ১৫০ টাকা। একটু দরদাম করে ১০০ টাকায় রফা হল। সত্যিই অনেকখানি ভিতরে।

রিক্সা থেকে নামতে নামতেই দেখি এক জন মানুষ এক মুখ হাসি নিয়ে এগিয়ে আসছেন। প্রায় হাতে ধরে নিয়ে এলেন তাঁর শো রুম কাম শিল্পালয়ে। আমি কাউন্টারের পিছনে টানিয়ে রাখা তাস গুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম যেমন প্রদীপশিখার দিকে এগিয়ে চলে পতঙ্গ। যে শিল্পের কথা পড়েছি বইয়ের পাতায় সেই অসামান্য শিল্প আর তাঁর স্রষ্টা দুজনেই আমার সামনে। এ আনন্দ ধরে রাখা সত্যিই যায় না।  সম্বিত ফিরল ওনার গলা শুনে “আপনি কি দেখবেন – পট না তাস”। আমি বললাম “পট অনেক দেখেছি যদিও প্রতি স্থানের পট চিত্রের চলন আলাদা, তবু যা দেখিনি কোন খানে তাই দেখব শুধু – দশাবতার তাস”। শিল্পী মেলে ধরলেন তাসের ডালি – কত তাঁর আকার, কত বৈচিত্র্য তাঁর গঠনে। কেউ বড়, কেউ ছোট, কেউ বা চৌকো। কেউ আছেন মণ্ডপের ভিতর – কেউ বাইরে। আমার কথা শুনে মানুষটি বুঝতে পেরেছেন আমি শুধু দেখতে বা কিনতে আসিনি আমি এসেছি জানতে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ! মানুষটি আনন্দিত হলেন – রিক্সাওয়ালা দাদাকে বললেন “একদম তাড়া দিবি না, দাদা জানতে চাইছেন আর আজ আমার কাছে প্রায় সব জিনিস আছে”। শুনতে লাগলাম কি ভাবে তৈরি হয় এ অসাধারণ শিল্প কৃতি।

কাপড়ঃ আগে পুরানো ধুতি ব্যবহৃত হত এখন মার্কিনের কাপড়। এই কাপড় সমান মাপে কেটে নিতে হবে।

আঠাঃ প্রথমে তেঁতুল বীজ বার করে ৩ – ৪ দিন শুকানোর পর ভাজতে হবে। তারপর ৫-৭ দিন জলে ভিজিয়ে রাখার পর যখন তা ফুলে উঠবে তখন হামানদিস্তায় গুঁড়ো করে ৪-৫ দিন শুকাতে হবে। তারপর সেটিকে আবার ফুটালে তৈরি হবে আঠা।  বেলের বীচি বার করে ৮-১০ দিন ভিজিয়ে জল ছেঁকে বেল আঠা বার করা হবে। এরপর তেঁতুল আঠা, শিরীষ আঠা ও বেলের আঠা নির্দিষ্ট ভাবে মিশিয়ে তৈরি হবে সম্পূর্ণ আঠা।

এই আঠা দিয়ে ৬-১০ পিস কাপড় জোড়া হবে। তারপর সেই কাপড় শুকিয়ে ডাইসে ফেলে চার চৌকো আকার দেওয়া হবে।কাপড় শুকানোর সময় সেই এলাকায় কারো যাওয়া বারণ কারণ এত পিচ্ছিল হয়ে থাকে যে অসাবধানে এক বার পা পড়লেই অবধারিত পপাত চ। তবু প্রতি বছরে ছোট খাটো ঘটনা ঘটেই থাকে।  কেটে নেওয়ার পর যে সুতো কাপড়ের চারধারে বেড়িয়ে থাকে তা পেয়ারা গাছের কাঠে তৈরি একটি যন্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে একই সঙ্গে সেটিকে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হবে। এবার আঁকার পালা। দরকার তুলি ও রং।

তুলিঃ ছাগলের ল্যাজের লোমে তৈরি তুলি ব্যবহার করা হয় কারণ এর রঙ ধারন ক্ষমতা অনেক বেশী।

রঙঃ মুলত প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার;

কালোঃ কাঠ কয়লা / ভুসো কালি।

হলুদঃ কাঁচা হলুদ

সবুজঃ শিম পাতা

লালঃ পাহাড় থেকে আনা পাথর।

সাদাঃ পাহাড় থেকে আনা পাথর

অরেঞ্জঃ লটকন

নীলঃ বাজার থেকে কেনা নীল বড়ি

প্রতিটি তাস একান্ত ভাবেই হাতে আঁকা। শিল্পী শীতল ফৌজদার জানালেন তিনি এই শিল্পী বংশের ৮৭তম উত্তরাধিকারী। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও জানালেন ওড়িশ্যার রঘুরাজ পুরে বনমালী মহাপাত্র, মাইসোরে রঘুপতি ভাট, অন্ধ্রে তপন কর্মকার এবং মহারাষ্ট্রে সাওন্তবাটি অঞ্চলে মহারানী পার্বতী সত্যশিলা দেবীর প্রেরনায় একজন শিল্পী এখনও এই ধারা বহন করে চলেছেন।

এই তাস খেলা এখন বিস্মৃতপ্রায়। তাসের দামও অনেক। ১০ টি তাসের দাম আকার বিশেষে ১২০০ – ২৫০০ টাকা পর্যন্ত। ১২০ টি তাসের দাম ১৫০০০ – ২৫০০০ পর্যন্ত হতে পারে। কাজ যত সূক্ষ্ম হবে তাসের দাম তত বাড়বে।

কথায় কথায় সময় কেটে গেল। ১০ মিনিটের জন্য এসেছিলাম ১ ঘণ্টা কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল জানি না। আমার সাধ্যমত ১০ টি তাস কিনে শীতল বাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সওয়ার হলাম রিক্সায়। জীবনের সঞ্চয়ে থেকে গেল অমলিন ১ ঘণ্টা।