ঘুরে এলাম শ্রীবাটি
শ্রী অর্থে সুন্দর এবং বাটি অর্থে বাড়ি।
বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী এলাকায় এর অবস্থান।
এখানে রয়েছে তিনটি শিব মন্দির !
শিব মন্দির নয় এখানে রয়েছে উনবিংশ শতকেও বাংলায় টেরাকোটা শিল্প জীবিত ছিল তার বাস্তব প্রমাণ।
শ্রীবাটির সবচেয়ে পুরানো মন্দিরের স্থাপনা ১৮০২ খ্রিস্টীয় শতক এবং অন্য দুটি মন্দির স্থাপিত হয়েছে ১৮৩৬ খ্রিস্টীয় শতকে। এই তথ্য গুগুল সার্চ করে পাওয়া।
এখানকার স্থানীয় মানুষদের অনেকেই এই মন্দিরের সম্পর্কে এই টুকু বলতে পারেন, এটা অনেক প্রাচীন মন্দির এবং এর সম্পর্কে যা লেখা আছে তা মন্দিরের গায়ে একটা কষ্টি পাথরের লিপি তে লেখা আছে। আপনারা ছবি তুলে নিয়ে যান, দেখে বুঝে নেবেন। আর গুগুল সার্চ করলে দেখতে পাবেন। এটা চন্দ্র পরিবারের স্থাপিত মন্দির, ২৫০/৩০০ বছর আগের।
অনেক অনুরোধের পরে একজন এলেন, তিনি তাও কিছু বলতে পারলেন।
প্রথম থেকেই আমার মনে হচ্ছিল এই মন্দির এর টেরাকোটার কাজ একটু অন্য রকম। এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি মিলে মিশে আছে। এই তিনটে মন্দিরে যে ছবি লেখা রয়েছে তার মধ্যে ভারতীয় প্রাচীন গল্প (রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ এর সাথে বাঙ্গালী মঙ্গলকাব্য) এর সাথে মিলে মিশে আছে অবিভক্ত বাংলায় ইউরোপিয়ান সময়ের প্রভাবের পরিচয়।
যিনি এসেছিলেন তিনি একটি প্যানেল নির্দিষ্ট করে দেখালেন যাতে শ্রীকৃষ্ণের দশাবতার দেখানো আছে। আছে সমাজের বিভিন্ন সময়ের – বিভিন্ন আঙ্গিকের মানুষের ছবি।
আমি জানি না, এই শিল্পের শিল্পী কে, কিন্তু একটা বিষয় আমাকে ভীষণ ভাবে অবাক করেছে
তা হল একটি দরজায় এক নারী মূর্তি
বদ্ধ দরজা, হয়তো সবে মাত্র খোলা হয়েছে –
সেই বদ্ধ দরজার বাইরে একটি মুখ, সেই মুখে আর্তনাদ অথবা কান্না! হাতের কবজি নিজেকে আড়াল করতে চাইছে।
উনবিংশ শতকে চন্দ্রবংশীয় এক নারীকে শিল্পী কি এই ভাবেই দেখলেন?
একি তাঁর কল্পনা অথবা কোন এক বাস্তব? এটা কি সেই সময়ের মহিলাদের যে ভাবে পর্দার আড়ালে রাখা হত তার বিরুদ্ধে শিল্পীর এক সচেতন প্রতিবাদ?
এছাড়াও বিভিন্ন প্যানেলের মূর্তি গুলো দেখলে দেখা যায়, (পুরাণ, মহাভারত বাদ দিয়ে) তাতে পুরুষ এবং নারী উভয়ের মুখে যন্ত্রণার এক ছাপ আছে। মনে রাখতে হবে এই শিল্পের জন্ম কাল ১৮০২ থেকে ১৮৩৬। এই প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, পলাশীর যুদ্ধ ১৭৫৭ সালে এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ১৭৯৩ সালে। ফলে ১৮০২ থেকে ১৮৩৬ এই সময় কালে যে শিল্পী এই রচনা করছেন তাঁর মনের মধ্যে সমসাময়িক সময়ের ছাপ পড়েছে এবং সেটাই তিনি প্রত্যন্ত এক স্থানের শিল্পে তা প্রতিভাত করেছেন, এটা চিন্তা করা বোধ হয় খুব অন্যায় হবে না। এমন কি দশ প্রহরণ ধারিণী দুর্গা মূর্তি এবং তাঁর পাশের দুই কিংকরী (হতেই পারে জয়া – বিজয়া) তাদের মুখেও শিল্পী যুদ্ধ জয়ের আনন্দের ছাপ রাখেন নি । আমার মনে প্রশ্ন জাগে কেন? আমি ভাবছি, তাহলে কি শিল্পী কি অনুমতি পেয়েছিলেন সেই মানুষের যে তাঁকে অর্থ দিয়ে এই মন্দির সৃষ্টি করতে বলেছিলেন? ব্রিটিশ শাসন তথা ব্রাহ্মণ্য বাদের অনাচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কি রূপান্তরিত হয়েছে শিল্পীর স্বাধীনতায়? মনে রাখতে হবে এই পরিবার জাত – পাতের নিয়ম মেনে বণিক অর্থাৎ বৈশ্য। ফলে ব্রাহ্মণদের নিয়মতান্ত্রিক অত্যাচার তাঁরা সেই সময়ে সামাজিক ভাবে সহ্য করে চলেছেন, সহ্য করতে বাধ্য হয়েছেন।
একটি প্যানেলে (উপর থেকে নিচে) দেখা যাচ্ছে পর পর কিছু মূর্তি (তা পুরাণের কোন কাহিনী হতেই পারে) যাতে দেখতে পাচ্ছি একটি মানুষের উপর একটি পশু, সেই পশুকে শিকার করছে এক মানুষ আবার তার উপরে অন্য পশু (হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ সবাই আছে এর মধ্যে)। এই প্যানেলটি কি বলতে চাইছে? এই প্রসঙ্গে একটু পড়তে গিয়ে জানতে পারলাম মাননীয় @শ্যামল কুমার ঘোষ তাঁর “বাংলার মন্দিরের খোঁজে – Temples of Bengal” - ত্রি মন্দির (শিব), শ্রী বাটি, পূর্ব বর্ধমান অংশে এই প্যানেল টির পরিচয় দিয়েছেন “মৃত্যু লতা” বলে। তাঁর কথায় মৃত্যু লতা মন্দিরের প্রান্ত বরাবর থাকে। আমি যখন “মৃত্যু লতা” দিয়ে গুগুল সার্চ করলাম তখন যা যা তথ্য পেলাম, তা সাজিয়ে দিচ্ছিঃ
১) 'মৃত্যুলতা' কী ?
➤ এর কোন সঠিক তথ্য নেই ! কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে , একজন অন্যজনকে আঘাত করতে করতে মরে। মৃত্যুর চেইন থেকে কেউ রেহাই পায়না। বাঁকুড়া বা রাঢ় অঞ্চলের টেরাকোটার মন্দিরগুলোর দেওয়ালে লম্বা করে বানানো এই ডিজাইন আমরা অনেকেই দেখেছি , কিন্তু কখনও এই বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি বলে মনে হয়না। গৌড়ের মন্দিরে যে টেরাকোটা দেখা যায় সেখানে সবাই মানুষ , একজন মানুষকে অন্যরা মারছে আবার সেখান থেকে জন্ম হচ্ছে নতুন মানুষের। (এই শব্দ গুলি লেখা আছে Indo Bangla Book Shop’s Facebook পাতায়) ।
২) Mrityulata" (Death-vine) - a mysterious decorative terracotta panel in Bengal temples
#mrityulata is mostly a vertical terracotta panel containing a vertical series of humanoid and animal figures, each poised to attack the figure below. But in some instances the serial figures are not attacking the figure just below, but displayed vertically one above the other in a peaceful way. Even very rarely there are copulating human figures too. This justifies the use of the term “#Kalpalata or “#Barsha” panel instead of “Mrityulata” for these panels.
৩) Description and types of "Mrityulata" panel
As already stated, Mrityulata is mostly a vertical terracotta panel containing a vertical series of humanoid and animal figures, each poised to attack the figure below. But this is only the common type.
In some instances the serial figures are not attacking the figure just below, but displayed vertically one above the other in a non-violent peaceful way.
Even rarely there are copulating human figures too. Copulation is never a means of "Mrityu" or death, but rather a way to "Janma" or birth.
This justifies the use of the term “Kalpalata” or “Barsha” panel instead of “Mrityulata” for these panels.
আমার অনুসন্ধানের - আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমি পেয়েছি বলে আমার মনে হয় নি। আমার প্রশ্নঃ
১) শিল্পীর কল্পনায় মৃত্যু লতা কি ভাবে এল?
২) জীবন এবং মৃত্যু দুটোই চির সত্য। সেক্ষেত্রে হিংস্রতার প্রকাশ কি ভাবে ঘটছে সাধারণ মানুষের জীবনে এবং তাও চরম হিংস্রতা?
৩) এক্ষেত্রে মেনে নিতে হবে আমাদের চির কালীন পারিবারিক জীবনে যে ভাবে আমরা পথ চলি, তার মধ্যে রাগ একটা অংশ এবং তার প্রয়োগ হয় আমাদের সাধারণ মানুষের উত্তেজিত আচরণের মাধ্যমে। মৃত্যু লতা কি তারই এক রূপক?
এই মন্দিরটি দেখার পর এই রকম অজস্র প্রশ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
সব মিলিয়ে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
সবার আগে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করব শ্রীযুক্ত অভিজিৎ দে র প্রতি (পূর্ব স্থলী গেস্ট হাউসের কেয়ার টেকার) কারণ তিনি না বললে এবং গাইড না করলে, হয়তো চুপি চর ঘুরে আসতাম কিন্তু এই অসাধারণ শিল্প দর্শন থেকে বঞ্চিত থাকতাম।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ @শ্যামল কুমার ঘোষ তাঁর “বাংলার মন্দিরের খোঁজে – Temples of Bengal” - ত্রি মন্দির (শিব), শ্রী বাটি, পূর্ব বর্ধমান ফেসবুক অংশ
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ “ত্রিবাটি” এবং “মৃত্যু লতা” সম্পর্কিত কিছু ওয়েব সাইট, খবরের কাগজের ফেসবুক পেজ।
যেটা এই সব পেজ থেকে জানতে পারি নি এবং জানার ইচ্ছা থাকল, তা হলঃ
১) বন্ধ দরজায় ওই নারী মুখ কেন?
২) কেন দুর্গা মূর্তির পাশে থাকা কিংকরী (এবং দুর্গা) র মুখে জয়ের উল্লাস নেই?
৩) কেন অনেক মূর্তি (বিশেষত নারী এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ) র আচরণে এবং মুখে কান্না / শোকের ছাপ?















No comments:
Post a Comment