18 November, 2014

কালো মেয়ের উপাখ্যান



আমি নিতান্তই এক কালো মেয়ে
তোমাদের সামনে দিয়ে
যাই চলে – প্রতিদিন
এক অবিবাহিত কালো মেয়ে।
হতে পারি আমি দিদিমণি,
হতে পারি আমি ডাক্তার,
হতে পারি আমি ইঞ্জিনিয়ার -
বা অন্য আরও কিছু ।
থাকতে পারি শহরে কিংবা গ্রামে,
তবু দিনের শেষে ঘরের কোনে
আমি এক অবিবাহিত কালো মেয়ে।

আমাকে নিয়ে বড় চিন্তা সবার,
যত না বাবা – মার
তার চেয়ে বেশী পাড়া – প্রতিবেশী,
আত্মীয় – স্বজনদের -
তারা তো হাজার হলেও চায় ভালো আমাদের !
বাড়িতে তারা এসে – চিন্তায় যায় ভেসে
বলে যায়
জমাও পয়সা বেশী বেশী করে,
পাত্র কিনতে হবে উঁচু দরে
কালো মেয়ের বিয়ের তরে।
ঘরের কোনে মিশে যাই লজ্জায় -
আমি যে এক কালো মেয়ে।

আজ কিন্ত আমার গায়ের রঙ সাদা
কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে বল আমায় -
কালো চামড়াটা গেছে -
গেছে দেখ আজ ঝরে
তোমাদের মনের জ্বালায় পুড়ে !
এবার হবে আমার বিয়ে
আমি তোমাদের সেই কালো মেয়ে।

17 November, 2014

একটা গল্প বলি



অনেক অনেক দিন আগে একটা দেশে
গড়ে উঠেছিল এক সুন্দর সভ্যতা।
সেই মানুষ গুলো বিশ্বাস করত তাঁদের রাজা
সূর্যের বংশধর আর তাই সর্বশক্তিমান !
বড় সহজ – সরল ছিল তাদের জীবন।
ঝগড়া ঝাঁটি কি হত না তাঁদের মধ্যে
তবু বড় ভালো ছিল ওঁরা।
ওদের শিল্পে ধরা পড়ত মানুষের
প্রতিদিনের কথা – ভালোবাসার কথা
ওঁরা বড় সুন্দর গান গাইত – ছবি আঁকত।

কথায় আছে না বেশী সুখ ভালো নয়
আবার দুঃখ কখনও আসে ছদ্মবেশে।
দূর সমুদ্র পার হয়ে এল তারা
সাদা ধবধবে গায়ের রঙ,
মুখের হাসিটাও বড় সুন্দর !
দুরন্ত গতিতে পার হয়ে গেল
ওদের মাঠ ঘাট পথ প্রান্তর -
এক অপরিচিত প্রাণীর পিঠে চেপে।
অতিথি বরণ করা ওদের নিয়ম
তাই ওঁরা বড় আদরে বরণ করে নিল তাদের।
ওরা হিংস্র জীব গুলো কে পারে নি চিনতে
ভেবেছিল – এসেছে ভালোবাসায় বদলে দিতে
এনে দিতে আরও সুন্দর এক জীবন।

ভাঙল ভুল অচিরেই
যখন দেখল -
ওদের সূর্য পুত্র রাজার মৃতদেহ পায়ে দলে
লুট করে চলে সোনা –
লুট করে চলে দেশের সম্পদ নির্বিচারে
কেউ পায় না ছাড় –
তা সে শিশু হোক কিংবা বৃদ্ধ
আর নারী –
সে তো বড় লোভনীয়
চিরকালের ভোগ্যা বীরের !
যারা অসহায় নারীর উপর অধিকার ফলায়
অস্ত্র হাতে একা বা একসাথে,
তারাই তো প্রকৃত বীর।
আজটেক সভ্যতার মানুষ গুলো আর
তাদের রাজা আতাহুয়ালপা পারেনি তাদের চিনতে
তাদের ছলনায় ভুল করেছিল
তাই মূল্য দিয়েছিল – নিষ্পিষ্ট হয়েছিল পদতলে।

কত মিল তাই না –
আজকের কত ঘটনার সাথে !
আজও আমরা পারিনা চিনতে অত্যাচারীর ছদ্মরূপ
বরণ করি ভালোবাসায়
ভাবি এরাই তো তারা, যারা আনবে পরিবর্তন।
তারপর –
তারপর প্রতিদিন রক্তাক্ত হয় আমাদের জীবন
শুদ্ধাচারী – অত্যাচারীর পদতলে।

তাদের গায়ের রঙ সেদিনও ছিল সাদা
বড় সুন্দর মুখের হাসিটাও –
তার আড়ালে লুকিয়ে ছিল রক্তমাখা এক দানবিক মুখ
মিল কি পেলাম খুঁজে –
প্রশ্ন করি নিজেকে
ভুল তো করেছি সবাই
শোধরাব না সাথী ?

10 November, 2014

প্রশ্ন

সমরেশ বসুর "শহীদের মা" গল্পের অনুপ্রেরণায় লেখা এই রচনা;



একটি অতিরিক্ত মুহূর্ত পেরেছ কি দিতে ?
পেরেছ কি রাখতে ধরে একটি জীবন ?
এক মা প্রশ্ন করে ।
তার ছেলে আজ বাড়ি ফেরে নি
খুব ভালো ছেলে ছিল জানেন
না লেখাপড়ায় না –
বড় বড় পাশ দিতে পারেনি সে,
চাকরীও করত না বিশাল কিছু
নাম হয় নি গানে বা বাজনায়-
সবুজ ঘাসের বুকে তার উদ্দাম নড়াচড়ায়
করতালিতে ওঠে নি ভরে মাঠ।
তবুও সে ছিল নিতান্তই এক ভালো ছেলে
আর সকলের মাঝে মিশে থাকা -
এক ভালো ছেলে।

এমন এক ভালো ছেলে
যে ঝগড়ায় জড়াতও না কোনদিন,
পাশের বাড়ির মাসিমা কিংবা
লাল বাড়ির দাদুর ঘরে ছিল
তার অবাধ যাওয়া আসা ।
নিজের বাড়ির কাজের সাথে
এদের টুকি টাকি চাহিদা মিটে যেত
নিঃশব্দে
আর রাত – বিরেতে ডাক্তার ডাকার দরকারে
তারই ঘরে পড়ত টোকা।

বাবা তার সরকারী কর্মচারী
(এখন অবসর)
তবু মরা হাতি লাখ টাকা
নয় কি তা !
বড়দা কলেজে পড়ায়
(নাম বিশাল) -
কতটা পড়ানোর আর কতটা
ইউনিয়নের জন্য মুস্কিল তা বলা।
মেজদা নাম কিনেছে অমুক দলের
পতাকার তলে দেশসেবার মন্ত্রে
(ক্ষমতা তারও বড় কম নয়)।
সেজদা কি করে ঠিক জানে না কেউ
তবে পোশাকের বাহার বড়,
বাইক ছুটে চলে রাস্তা কাঁপিয়ে
মুখে বিজাতীয় গন্ধ ও ভাষা
একসাথে হয় মাখামাখি।

বাড়িতে একে অপরের মুখ দেখে না কেউ
কারণ দেখা হলেই যে আগুন জ্বলে
তখন যায় বোঝা
বাবা ও তার তিন ছেলে করে দেশসেবা ।
কে বড় সেবক তর্ক লাগে তার !
ছোট ছেলে নীরবে যায় চলে
দেখে না কেউ।
শুধু মা ছাড়া –
মা তো ভালোবাসে সব্বাইকে
ছোট জন কে যেন একটু বেশী।

এক সন্ধ্যা –
অন্যদিনের মত বয়ে চলে সময়,
রাত গভীরতর হয়
বাড়ি ফেরে নি ছোট ছেলে।
টিক্‌ টিক্‌ শব্দ হত আগে দেওয়াল ঘড়িটায়
এখন সেটা নীরবে দেওয়ালে ঝোলে
ওর দম হয়ে গেছে শেষ,
এগিয়ে চলা সময়ের দৌড়ে
থেমে গেছে ওর চলা।
রাত বাড়ে –
বুকের আকুতি নিয়ে মা ডেকে তোলে সবাইকে
বিরক্ত সকলে – গেছে কোথাও
আসবে ফিরে সকালে।
বাড়িটা আবার ঘুমিয়ে পড়ে
একা মা থাকে জেগে – প্রতীক্ষায়।
সময় বয়ে চলে।
রাত হল ভোর
বাড়িটা সচল হল
হঠাৎ করে খেয়াল হয় একজনের
ফিরেছে কি সে রাতে ?
চঞ্চল হয় – অস্থির হয় আওয়াজে
নানা রকম শব্দ – নানা সুর শোনা যায়
বাড়িটার মাঝে
নীরবে বসে থাকে মা
না সেই শব্দ আসে না তার কানে।

আবার সন্ধ্যা নামে
সারাদিন হাসপাতাল, পুলিশ আরও কত
জায়গা ঘোরা শরীর গুলো ফিরে আসে ঘরে
তার একটু বাদেই
বাড়িটা কেঁপে ওঠে –
নানা রকম কথার আওয়াজে কাঁপতে থাকে বাড়িটা
ঠিক অন্য দিনের মত
তফাত শুধু একটাই
অন্য দিনের মত ওদের সামনে দিয়ে
নীরবে যায় না হেঁটে বাড়ির সেই ছোট ছেলে
হয় তো বা যাবে না আর কোনোদিন
একলা ঘরে কেঁদে চলে মা !